আজ ৫ই শ্রাবণ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ২০শে জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

সময় : রাত ৪:২২

বার : শনিবার

ঋতু : বর্ষাকাল

যিনি রক্তের গ্রুপ আবিষ্কার করেছেন।

১৮৬৮ সালের ১৪ জুন ভিয়েনায় জন্মগ্রহণ করেন কার্ল ল্যান্ডস্ট্যাইনার
১৯৩৭ সালে আবিষ্কার করেন ‘রেসাস ফ্যাক্টর’
১৯৩০ সালে যুগান্তকারী আবিষ্কারের জন্য চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পান

প্রাচীনকালে যুদ্ধে বা কোনো দুর্ঘটনায় মানুষের দেহের কোনো অংশ কেটে গেলে তার একমাত্র চিকিৎসা ছিল পরিষ্কার কাপড় দিয়ে বেঁধে রক্ত বন্ধ করার চেষ্টা করা। দেহ থেকে অতিরিক্ত রক্ত বের হয়ে গেলে রোগী রক্ত স্বল্পতার কারণে ঢলে পড়ত মৃত্যুর কোলে। তখনো রোগীকে অন্য কারও রক্ত দিয়ে রক্তপূরণের চিকিৎসা আবিষ্কার হয়নি। সেই মধ্যযুগেই কেন, ১৯০০ সালের আগেও রোগীর দেহে রক্ত সঞ্চালনের ফলে রোগীর সুস্থতা নিয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা যেত না।

চিকিৎসকরা শেষ চেষ্টা হিসেবে রক্ত সঞ্চালনের সিদ্ধান্ত নিতেন কারণ অধিকাংশ সময় রক্ত সঞ্চালনের ফলে রোগী মারা যেত আর যারা বেঁচে যেত চিন্তা করা হত তারা স্রেফ তাদের কৃতকর্মের বদৌলতে এ যাত্রা রক্ষা পেয়েছেন। মানুষের জীবনমরণের এমন নাজুক অবস্থা বদলে যায় এক অস্ট্রিয়ান গবেষকের গবেষণার বদৌলতে। তার নাম কার্ল ল্যান্ডস্ট্যাইনার।
কার্ল ল্যান্ডস্ট্যাইনার ১৮৬৮ সালের ১৪ জুন অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় জন্মগ্রহণ করেন। বাবা লিওপোল্ড ল্যান্ডস্টাইনার ছিলেন আইন গবেষক ও ‘ডাই প্রেস’ পত্রিকার প্রধান সম্পাদক। মাত্র ৭ বছর বয়সে বাবাকে হারিয়ে কার্ল তার মা ফ্যানি নি হ্যাসের আদর-স্পর্শে বড় হতে থাকেন। ছোটবেলা থেকেই কার্লের মনের সুপ্ত ইচ্ছা ছিল ডাক্তার হওয়ার। স্কুল-কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে কার্ল ১৭ বছর বয়সে সেই ইচ্ছা পূরণের জন্যই ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল স্কুলে গিয়ে ভর্তি হন।বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়েই গবেষক হিসেবে নিজের দক্ষতা প্রমাণ করেন কার্ল। মাত্র ২৩ বছর বয়সেই রক্তের উপাদানের ওপর খাদ্যের প্রভাব বিষয়ে গবেষণা করে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন তিনি। আরও উচ্চতর গবেষণায় নিজেকে নিয়োজিত করতে পাড়ি জমান জার্মানি ও সুইজারল্যান্ডে।

বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সুনামের সঙ্গে কাজ করে ১৮৯৬ সালে তিনি নিজ দেশে ফিরে আসেন। ভিয়েনা হাসপাতালের গবেষক ম্যাক্স ফন গ্রোভারের সঙ্গে সহকারী গবেষকের ভূমিকায় কাজে যোগ দেন। দেশে ফিরে হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত থাকায় তিনি লক্ষ্য করেন রক্ত সঞ্চালন সংক্রান্ত জটিলতা। রক্ত সঞ্চালনের ফলে কেন অধিকাংশ রোগী মারা যাচ্ছে আর কেনইবা অল্প কিছু মানুষ বেঁচে যাচ্ছেন সে ব্যাপারে তিনি কৌতূহলী হয়ে উঠেন। শুরু করেন এই রহস্য উদঘাটনের জন্য গবেষণা।

কার্ল বিভিন্ন মানুষের রক্ত সংগ্রহ করে গবেষণাগারে এক রক্তের সঙ্গে আরেক রক্ত মিশিয়ে পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করেন কী ঘটে। তিনি দেখলেন, কিছু রক্তের মিশ্রণে রক্ত জমাট বেঁধে যাচ্ছে আবার, কিছু ক্ষেত্রে রক্ত জমাট বাঁধছে না। জমাট বাঁধার ধরনেও ভিন্নতা লক্ষ্য করেন তিনি। এক বছর নিরবচ্ছিন্ন গবেষণার পর রক্তের অ্যান্টিবডি-এ এবং অ্যান্টিবডি-বি আবিষ্কার করেন। দুটোর উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে রক্তকে এ, বি, ও (এবিও)- তিনটি ভাগে ভাগ করেন। আরও এক বছর কার্ল ও তার সহকর্মীরা গবেষণা করে চতুর্থ বৈশিষ্ট্যধারী রক্ত এবি (এবি) গ্রুপ নির্ণয় করেন। এর ফলে নির্ধারণ করা গেল কোন ব্লাড গ্রুপধারী রোগীর দেহে কোন গ্রুপের রক্ত দেওয়া যাবে। এর ফলে রক্ত সঞ্চালনের পরে রোগীর মৃত্যুর হার কমে গেল বিপুলভাবে।

এত সফলতার পরও কিছু রোগীর শরীরে কিছু জটিলতা প্রকাশ পেতে লাগল। কার্ল ল্যান্ডস্ট্যাইনার ফের গবেষণায় মনোযোগী হন। সহযোগী আলেকজান্ডার ওয়াইনারকে নিয়ে রেসাস প্রজাতির বানরের দেহের ওপর পরীক্ষা চালান। সেখানে কিছু ফ্যাক্টর লক্ষ্য করেন তিনি। এরপর মানব শরীরে একই পরীক্ষা চালান। মানব শরীরে ফ্যাক্টরের উপস্থিতি নির্ণয় করেন সফলভাবে।

১৯৩৭ সালে রেসাস বানরের নামের সঙ্গে মিলিয়ে কার্ল ল্যান্ডস্ট্যাইনার আবিষ্কার করেন ‘রেসাস ফ্যাক্টর।’ এতে করে এ, বি, ও (এবিও) গ্রুপের সঙ্গে গাণিতিক চিহ্ন যোগ ও বিয়োগ যুক্ত করে রেসাস ফ্যাক্টরের উপস্থিতি আলাদা করা হয়। সেই থেকে আজ পর্যন্ত রক্তের গ্রুপিং প্রক্রিয়া এভাবেই হয়ে আসছে। যা সহজ করেছে রক্তদান এবং নিশ্চিত করেছে নিরাপত্তা।

কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে আহতদের বা অস্ত্রোপচারের সময় রোগীর বা শিশু জন্মদানের সময় প্রসূতি মায়ের সবচেয়ে বেশি যে জিনিসের প্রয়োজন হয় তা হলো রক্ত। এই রক্ত গবেষণাগারে প্রস্তুত করা যায় না। একজনের দেহের অতিরিক্ত রক্ত আরেকজনের দেহে প্রবেশ করিয়ে জীবন রক্ষা করতে হয়। কিন্তু গ্রুপ অনুযায়ী রক্ত না দিলে মৃত্যু অবধারিত। আর এই কাজটিই করেছেন কার্ল ল্যান্ডস্ট্যাইনার। এর ফলে দুর্ঘটনায় রক্তক্ষরণের কারণে মৃত্যুমুখী রোগীসহ প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধসহ অন্যান্য যুদ্ধে আহত সৈন্যদের জীবন বাঁচানো সম্ভব হয়েছিল।

চিকিৎসা জগতে এই আবিষ্কারের প্রভাব সুদূরপ্রসারী। তার এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের জন্য ১৯৩০ সালে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারে সম্মানিত করা হয়। এ ছাড়াও তিনি নানা পুরস্কার লাভ করেছেন। কিন্তু এত অর্জনের পরও তিনি গবেষণায় ছিলেন অক্লান্ত। গবেষণা ছেড়ে একদিনও থাকেননি। এমনকি ১৯৪৬ সালের ২৬ জুন তার মৃত্যুও ঘটে গবেষণাগারেই, গবেষণারত অবস্থায়। জ্ঞানসাধক এই মানুষটির জীবনাচরণ হিতবাদী মানুষের অনুপ্রেরণা জুগিয়ে যাবে আজীবন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     More News Of This Category