আজ ২৯শে আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ১৩ই জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

সময় : রাত ১১:২৮

বার : শনিবার

ঋতু : বর্ষাকাল

নতুন ভয় পুরান ভূতে ।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে আবারও নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন রোহিঙ্গারা। জোর করে তাঁদেরকে দলে অন্তর্ভুক্ত করতে চাইছে মিয়ানমারের সেনারা। আবার সেনাদের সঙ্গে কাজ করার অভিযোগে, তাঁদের ওপর নির্যাতন চালাচ্ছে আরাকান আর্মি। বিশ্লেষকরা বলছেন, রাখাইনে জাতিগত উত্তেজনা সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। আর এতে তারা সফল হচ্ছে।রোহিঙ্গা যুবক আবু বক্কর (ছদ্ম নাম)। এক দিন কক্সবাজারে কুতুপালংয়ে রোহিঙ্গা শিবিরের বাইরে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিলেন তিনি। তখন একদল লোক তাঁর বাড়িতে আসে তাঁকে তুলে নেওয়ার জন্য। বক্কর জানান, ওই বন্দুকধারীরা রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও) নামের একটি গোষ্ঠীর সদস্য। তারা মিয়ানমারের জান্তা সরকারের হয়ে কাজ করে। এই জান্তা সরকারই ২০২১ সালে মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতায় আসে।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে আবারও নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন রোহিঙ্গারা। জোর করে তাঁদেরকে দলে অন্তর্ভুক্ত করতে চাইছে মিয়ানমারের সেনারা। আবার সেনাদের সঙ্গে কাজ করার অভিযোগে, তাঁদের ওপর নির্যাতন চালাচ্ছে আরাকান আর্মি। বিশ্লেষকরা বলছেন, রাখাইনে জাতিগত উত্তেজনা সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। আর এতে তারা সফল হচ্ছে।

রোহিঙ্গা যুবক আবু বক্কর (ছদ্ম নাম)। এক দিন কক্সবাজারে কুতুপালংয়ে রোহিঙ্গা শিবিরের বাইরে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিলেন তিনি। তখন একদল লোক তাঁর বাড়িতে আসে তাঁকে তুলে নেওয়ার জন্য। বক্কর জানান, ওই বন্দুকধারীরা রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও) নামের একটি গোষ্ঠীর সদস্য। তারা মিয়ানমারের জান্তা সরকারের হয়ে কাজ করে। এই জান্তা সরকারই ২০২১ সালে মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতায় আসে।

মিয়ানমারের কোনো নাগরিককে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীমিয়ানমারের কোনো নাগরিককে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
বক্কর মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ রোহিঙ্গাদের একজন। গৃহযুদ্ধের কারণে লাখ লাখ রোহিঙ্গার মতো তিনিও পরিবার নিয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিয়েছেন। মিয়ানমারের বর্তমান জান্তা সরকার বিদ্রোহী গোষ্ঠীদের কাছে দেশের বিভিন্ন স্থানের নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে তারা রোহিঙ্গাদের তাদের দলে ভেড়াতে চাইছে।

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এটি রাখাইনের মতো জায়গায় নিজেদের জনপ্রিয়তা বাড়াতে জাতিগত উত্তেজনা বাড়াতে চাইতে পারে। এর আগেও এই রাজ্য এ কারণে বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছে।

বক্কর জানান, তাঁকে সীমান্তের ওপারে রাখাইনের মংডুতে একটি সেনা ঘাঁটিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানে যেখানে জান্তা সৈন্যরা তাকে অস্ত্র এবং প্রশিক্ষণ দিয়ে আরাকান আর্মির (এএ) বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পাঠায়।

রাখাইন রাজ্যের বৌদ্ধ সংখ্যাগুরুদের একটি সশস্ত্র সংগঠন হলো আরকান আর্মি। তারা রাখাইনকে স্বাধীন করতে মিয়ানমারের জান্তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। মিয়ানমারে গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার পর রোহিঙ্গাদের জান্তাদের জোর করে দলে ভেড়ানো মিয়ানমার সেনাদের জন্য একটি সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সিঙ্গাপুরভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক বলছে, প্রায় ৫ হাজার রোহিঙ্গা মিয়ানমারের সেনা দলে যুক্ত হয়েছে।বিশ্লেষকদের মতে, এর বড় কারণ হচ্ছে মিয়ানমারের জান্তাদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। সম্প্রতি সময়ে রাখাইনে ১৭টি এলাকার নয়টি দখলে নিয়েছে আরাকান আর্মি। আর এসব এলাকার বেশিরভাগই বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী। মিয়ানমারের সেনারা দেশটির অন্যান্য স্থানেও নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে।

গত ফেব্রুয়ারিতে জান্তার নেতা জেনারেল মিন অং হ্লাইং সৈন্য সংখ্যা বাড়ানোর জন্য জন্য একটি গোপন নিয়োগ আইন চালু করেন। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এই আইন শুধু বার্মিজ নাগরিকদের জন্য প্রযোজ্য। এদিকে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে গণ্য না করলেও তাদেরকে কোনোভাবে সেনাদের দলে যুক্ত করা হচ্ছে। মাত্র সাত বছর আগেই এই মিয়ানমারের সেনারা তাদের ওপর নির্মম অত্যাচার চালিয়েছে। হত্যা, ধর্ষণের মতো ঘটনা থেকে বাঁচতে প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা তখন বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। তখন জাতিসংঘ এসব ঘটনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধ বলে অভিহিত করে।

মিয়ানমারে আরএসওর মতো ছোট মিলিশিয়াদের কাছ থেকে সহায়তা পায় মিয়ানমারের জান্তারা। এই দলগুলো চাঁদাবাজি ও মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত। তারা কুতুপালংয়েও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালায়। তবে আরএসও জোর করে রোহিঙ্গাদের জান্তাদের দলে অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি অস্বীকার করেছে। তবে দুজন ভুক্তভোগীর পরিবার জানায়, গত মে মাসের শেষের দিকে মিয়ানমারের সেনাদের দলে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় দুজনকে গুলি করে হত্যা করে আরএসও।

অভিযোগ রয়েছে, রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে নিরাপত্তার ঘাটতির কারণে সেখানে অনয়াসেই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালানো যাচ্ছে। সেখানকার নিরাপত্তার দায়িত্ব আছে বাংলাদেশ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন)। রোহিঙ্গারা বলছেন, এই বাহিনী নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ, বিশেষ করে রাতের বেলা। তাঁদের সঙ্গে সন্ত্রাসীদের যোগসাজশ রয়েছে বলেও অভিযোগ আছে।

ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গতকাল সোমবারও কক্সবাজারের উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সন্ত্রাসীদের গুলিতে তিনজন রোহিঙ্গা নিহত হয়েছেন। এ সময় আহত হয়েছেন আরও তিনজন। তবে বাংলাদেশ সরকার বরাবরই রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিরাপত্তা ঘাটতির কথা অস্বীকার করে আসছে।

এদিকে রাখাইনে থাকা অনেক রোহিঙ্গা আবার নিজেদের ইচ্ছায় জান্তাদের দলে ভিড়ছে। এখনও রাখাইনে প্রায় ৬ লাখ রোহিঙ্গার বাস। এদের মধ্যে অনেকেই জান্তাদের কাছ থেকে নাগরিকত্ব পাওয়া বা খাবারের লোভে সেনাবাহিনীতে যুক্ত হচ্ছে।

রোহিঙ্গাদের অধিকার নিয়ে নিয়ে কাজ করা অ্যাক্টিভিস্ট না সান লুইন ব্রিটিশ সাময়িকী দ্যা ইকোনোমিস্টকে জানান, এ পর্যন্ত যুদ্ধে ৬০ জন রোহিঙ্গার মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া রাখাইনে সেনাবাহিনীতে নিয়োগ ও চাঁদাবাজির অভিযোগেও তাদের টার্গেট করছে আরাকান আর্মি। আবার সেনাবাহিনীতে যোগ না দিলেও আরাকান আর্মির হাতে রোহিঙ্গাদের মরতে হচ্ছে। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মি উভয়ই রোহিঙ্গাদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় একে অপরকে দোষারোপ করে। গত মে মাসে মার্কিন সম্প্রচারমাধ্যম সিএনএন একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী বুথিডং শহর গত শনিবার দখলে নিয়েছে বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি। সেখানে রোহিঙ্গাদের বাড়িতে আগুন দিচ্ছে তারা। সেইসঙ্গে চালাচ্ছে লুটপাটও। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি বলছে, ২০১৬ ও ২০১৭ সালে এই ধরনের নির্যাতন চালানো হয়েছিল রোহিঙ্গাদের ওপর। ওই সময় প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেয়।

অবশ্য এ তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে পারেনি সিএনএন। তবে স্যাটেলাইট থেকে প্রাপ্ত ছবিতে দেখা যায়, বুথিডংয়ের কেন্দ্রীয় শহরে বিশাল এলাকাজুড়ে আগুন জ্বলছে।রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো বলছে, প্রায় ২ লাখ মানুষ আরাকান আর্মির ভয়ে বুথিডং ছেড়েছে। এদের মধ্যে অনেক নারী, শিশু রয়েছে যারা খাবার, ওষুধ ছাড়াই ধান খেতের মধ্যে আশ্রয় নিয়েছেন। সেখানে হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে। তবে এর সংখ্যা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

বেসরকারি সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের সদস্য থোমাস কিন বলেন, জান্তা রাখাইনে জাতিগত উত্তেজনা সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে। আর এতে তারা সফলও হচ্ছে।

যদিও আরাকান আর্মি রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের কথা অস্বীকার করে। তবে তাদের মতে, রোহিঙ্গারা বাঙালি। আর রোহিঙ্গাদের মতে, রাখাইনে যুদ্ধের কারণে পুরান ভয় তাদের নতুন করে ভয় দেখাচ্ছে।

ইয়াসিন আরাফাত, ঢাকা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     More News Of This Category