আজ ৫ই শ্রাবণ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ২০শে জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

সময় : রাত ২:২৫

বার : শনিবার

ঋতু : বর্ষাকাল

সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে তিস্তা প্রকল্প নিয়ে সরকারকে

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ যাবৎ যতবারই ভারত সফর করেছেন, ততবারই তিস্তাপারের ভুক্তভোগী মানুষ পানিবণ্টন চুক্তির শুভ সংবাদ শোনার অপেক্ষায় থেকেছেন। ২১ ও ২২ জুন প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরকালেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি; কিন্তু এ ব্যাপারে ভালো কোনো সংবাদ পায়নি। ভারত এবার বাংলাদেশের সঙ্গে তিস্তাচুক্তি এড়িয়ে নদীব্যবস্থাপনার একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রস্তাব দিয়েছে। তাতেই শেখ হাসিনা এবং তার সরকার মনে করছে, এতে করে তিস্তার পানির সমস্যার একটি স্থায়ী সমাধান হবে। সফর-উত্তর সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী এ বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন। তবে, দেশের কূটনৈতিক ও পানি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, তিস্তার পানি সমস্যা সমাধানে ভারতের দেওয়া নতুন প্রস্তাবকে বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক হিসাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। বরং ভারতের এ নতুন প্রস্তাব তিস্তার পানি সমস্যা সমাধানের পথকে আরও দীর্ঘায়িত করবে।ভারত এ প্রস্তাব দেওয়ার অনেক আগেই তিস্তায় এ প্রকল্প যাচাই করতে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড ও পাওয়ার চায়না যৌথভাবে প্রায় ৩ বছর কারিগরি সমীক্ষা চালায়। সমীক্ষা শেষে তারা তিস্তা নদীব্যবস্থাপনার একটি প্রস্তাবও তৈরি করে। প্রস্তাবে তিস্তা নদীর গভীরতা বৃদ্ধি করা, বর্ষাকালে ভারত ওপার থেকে পানি ছেড়ে দিলে তিস্তার দুপারের মানুষকে সম্ভাব্য বন্যার হাত থেকে বাঁচানোর জন্য অতিরিক্ত পানি সংরক্ষণের জন্য জলাধার ব্যবস্থা এবং শুকনো মৌসুমে ভারত নদীর পানি আটকে দিলে, এ জলাধারের পানি দিয়ে কৃষি কাজ চালানো, ভূমি উদ্ধার করে সেচ, নৌ চলাচল, নদীর দু’পারে সড়ক নির্মাণ, পর্যটন, আবাসনসহ শিল্পায়নের কথা উল্লেখ করা হয়। কয়েক বছর আগেই চীন এ প্রস্তাবটি বাংলাদেশ সরকারের কাছে পেশ করে। এ মহাপরিকল্পনার আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা দিতে চীন যখন প্রস্তুত এবং বাংলাদেশ সরকারকে বারবার তাগাদা দিচ্ছে, ঠিক তখন তিস্তা প্রকল্পের নতুন প্রস্তাব নিয়ে ভারত হাজির হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সফরকালে স্বাক্ষরিত সমঝোতা চুক্তি মোতাবেক ভারত তাদের কারিগরি দল পাঠিয়ে প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই করতে কয়েক বছর লেগে যাবে। তারপর প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে আরও কত বছর লাগবে, তা এ মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না। পানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ কারণে তিস্তা প্রকল্প যে ঝুলে যাবে সন্দেহ নেই। সফর শেষে শেখ হাসিনা যে বক্তব্য দিয়েছেন, তাতে মনে হচ্ছে, তিনি ভারতকেই এ প্রকল্পটি দেওয়ায় ইচ্ছুক। দ্বিপাক্ষিক সফর নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘তিস্তার পানির দাবি অনেক দিনের। ভারত যদি প্রজেক্টটা করে দেয়, তাহলে আমাদের সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেল। সেটাই আমার জন্য বেশি সহজ হলো না?’ যদিও তিনি চীন ও ভারতের প্রস্তাব যাচাই করে যেটি গ্রহণযোগ্য হয়, তাই করা হবে বলেছেন।

শেখ হাসিনার বক্তব্য ও ভারতের সঙ্গে তার সম্পর্কের বাস্তবতা বিশ্লেষণ করে এটি নিশ্চিতভাবে বলা যায়, তিস্তা প্রকল্প এখন ভারতের মাধ্যমেই বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যাবে সরকার। এ বিষয়ে পানি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভারতের মাধ্যমেই যদি এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়, তাহলে এটি স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে, আমরা তিস্তার পানি সমস্যা সমাধানে দীর্ঘসূত্রতার পাল্লায় পড়ব সন্দেহ নেই। এ প্রকল্প এখন ঝুলে যাবে এবং আগামী দুই-চার বছরের মধ্যে এখানে বড় কোনো প্রগ্রেস দেখতে পাওয়া যাবে, তেমন কোনো সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছি না। পানি ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাতের মতে, পানি চুক্তি ছাড়া তিস্তা প্রকল্প সমস্যার সমাধান হবে না। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী, প্রত্যেকটা কাজে স্বচ্ছতা থাকতে হবে, জবাবদিহিতা থাকতে হবে। প্রত্যেক কাজে যারা স্টেকহোল্ডার, তাদের সঙ্গে অংশীদারত্ব থাকতে হবে। অথচ আমরা জানি না কী হতে যাচ্ছে। এ প্রকল্প নিয়ে চীন যখন অনেক আগেই অনেকদূর এগিয়ে এসেছিল, সেখানে ভারত হঠাৎ এসে বলছে, এ প্রজেক্ট তারা বাস্তবায়ন করবে। এখন তারা সমীক্ষা চালাবে। এ সমীক্ষা চালাতে তারা নিশ্চয়ই ন্যূনতম তিন-চার বছর চাইবে। কাজেই এ প্রকল্প বাস্তবায়ন আরও অনেক বছর পিছিয়ে যাবে।

এ প্রকল্প যদি ভারতকেই দেওয়া হয়, তাহলে এর ব্যয়ভার বহন করবে কে? ভারত নিশ্চয়ই নিজ খরচে করে দেবে না। প্রকল্পটি যেহেতু বাংলাদেশের, কাজেই এর ব্যয় বাংলাদেশকেই বহন করতে হবে। এ প্রকল্পের জন্য যে খরচ লাগবে, ভারত হয়তো আপাতত সে অর্থের ব্যবস্থা করে প্রকল্প শেষ করে দেবে। সে অর্থ ভবিষ্যতে বাংলাদেশকেই পরিশোধ করতে হবে। অর্থাৎ এ বিরাট অর্থ পরিশোধের ভার গিয়ে পড়বে এ দেশের প্রতিটি নাগরিকের ওপর। প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশের জনগণ কেন এ প্রকল্পের ব্যয় বহন করবে? আন্তর্জাতিক নদী আইন অনুযায়ী, বাংলাদেশের তো বিনা খরচেই তিস্তার পানি পাওয়ার কথা। ভারত প্রতিনিয়ত আন্তর্জাতিক নদী আইন লঙ্ঘন করে বছরের পর বছর তিস্তার পানি আটকে রেখে বাংলাদেশের জন্য সমস্যার সৃষ্টি করবে, আবার বাংলাদেশের জনগণের অর্থ ব্যয় করেই তাদের সৃষ্ট সে সমস্যার সমাধান করে দেবে, এ কেমন কথা! ভারতের দেওয়া এ অর্থ যদি সুদমুক্ত না হয়, তাহলে প্রকৃত খরচের সঙ্গে সুদের টাকাও প্রদান করতে হবে। অর্থাৎ এখানে ভারতের জন্য বড় অঙ্কের মুনাফা অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে। প্রশ্ন উঠতে পারে, এ প্রকল্প যদি চীন করে দিত, তাহলে সে খরচও তো বাংলাদেশকেই বহন করতে হতো। এ কথা ঠিক। কিন্তু গত একযুগ ধরে তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তি ঝুলিয়ে রেখে প্রতিবেশী রাষ্ট্রটি বাংলাদেশের মানুষকে যে ভোগান্তির মধ্যে ফেলেছে, তা থেকে পরিত্রাণ পেতেই বাংলাদেশ বাধ্য হয়েছে প্রচুর অর্থ ব্যয়ে চীনের সাহায্যে এ প্রকল্প বাস্তবায়নে মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করতে।

ভারত যদি তিস্তা প্রকল্প করে এবং এ প্রকল্পে যে অর্থ ব্যয় হবে, এসব নিয়ে যে কেউ ভাবেনি তা নয়। এ বিষয়টি ভারতের একাধিক পর্যবেক্ষক ও বিভিন্ন থিংকট্যাংকের গবেষকদের চোখ এড়িয়ে যায়নি। তাদের অনেকেই এ বিষয় নিয়ে মতামত দিয়েছেন। এসব মতামতের খবর আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় প্রকাশিতও হয়েছে। ভারতের প্রথম সারির স্ট্র্যাটেজিক থিংকট্যাংক ‘মনোহর পরিক্কর ইনস্টিটিউট ফর ডিফেন্স স্টাডিজ অ্যান্ড অ্যানালিসিস’র সিনিয়র ফেলো সম্রুতি পট্টানায়ক বলেছেন, বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে রেলওয়ে করিডর বা তিস্তা প্রকল্পের মতো পদক্ষেপ বাস্তবায়িত করতে হলে ভারতকেও গুরুত্বপূর্ণ ও বড়সড় ‘ছাড়’ দিতে হবে। তিস্তা প্রকল্পে ভারতের অর্থায়নের একটা বিরাট অংশ ঋণের টাকা অনুদানে (grant) পরিবর্তন করার মতো সম্ভাব্য ছাড়ের কথা ভারতের এ গবেষক তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন। যদিও এসব সেখানকার থিংকট্যাংকের গবেষকদের মতামত এবং পরামর্শ। কিন্তু এ বিষয়ে ভারত সরকার কী বলে সে সম্পর্কে কিছু জানা যায়নি। ভারত সরকারের পক্ষে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বার্তাও দেওয়া হয়নি। তবে, এ প্রকল্পের যাবতীয় খরচের অর্থ সম্পূর্ণ কিংবা আংশিক বাংলাদেশকে অনুদান হিসাবে দেওয়া হবে কিনা, চুক্তি স্বাক্ষরকালে ভারত এমন কোনো প্রতিশ্রুতি শেখ হাসিনাকে যে দেয়নি, তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। তা না হলে সফর শেষে সংবাদ সম্মেলনে ভারতকে প্রকল্প দেওয়ার পক্ষে যুক্তি দেখাতে গিয়ে তিনি অর্থ খরচের এ বিষয়টি উল্লেখ করতেন।

ভারত এ প্রকল্প করতে গিয়ে অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বাধার সম্মুখীন হবে। এ ব্যাপারে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি ইতোমধ্যে চিঠি লিখে, ‘রাজ্যবাসীর স্বার্থের সঙ্গে আপস’ করে বাংলাদেশের সঙ্গে পানি নিয়ে কোনো চুক্তি মেনে নেওয়া হবে না বলে হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গ আপত্তি তুললেও এ প্রকল্প থেকে সরে আসার কোনো পরিকল্পনা নেই বলে ভারতীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। অপরদিকে এ প্রকল্প নিয়ে বাংলাদেশে বিরোধিতা শুরু হয়ে গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চোখ রাখলেই এর উত্তাপ টের পাওয়া যায়। তবে বাংলাদেশের মানুষের এ মনোভাব বা বিরোধিতাকে ভারত সরকারের কর্মকর্তা বা কূটনৈতিক মহল মোটেও পাত্তা দিচ্ছে না। তারা এক সাক্ষাৎকারে বিবিসিকে বলেছেন, গত দশ-পনেরো বছরে এমন অনেক উদ্যোগই বাংলাদেশের মানুষের বাধার মুখে পড়েছে, কিন্তু তাতে কী হয়েছে? শেষ পর্যন্ত ‘দুদেশের সরকার’র সদিচ্ছায় সেসব প্রকল্পই সফলভাবে রূপায়িত হয়েছে। তিস্তা প্রকল্পের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হবে না। ভারতীয় কর্মকর্তাদের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, ভারত প্রবলভাবে আত্মবিশ্বাসী, এ প্রকল্প অবশ্যই বাস্তবায়িত হবে।

কিন্তু এত অর্থ ব্যয় করে তিন বছরব্যাপী জরিপ কার্য চালিয়ে চীন যে তিস্তা মহাপরিকল্পনা সরকারের কাছে জমা দিয়ে রেখেছে, তার কী হবে? কারণ চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কও কম গভীর নয়। চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার এবং চীনের কাছ থেকে বাংলাদেশ বড় অঙ্কের বিনিয়োগ পায়। আমার এ লেখা যখন প্রকাশিত হবে, তখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী চীন সফরে থাকবেন। সফরকালে চীনের পক্ষ থেকে তিস্তা প্রকল্পের বিষয়টি উত্থাপিত হবে সন্দেহ নেই। এ ক্ষেত্রে চীনকে কীভাবে সামাল দেওয়া হবে, তা একমাত্র শেখ হাসিনাই বলতে পারবেন। আশা করা যায়, এ নিয়ে আলোচনার মাধ্যমেই গ্রহণযোগ্য সমাধানের পথে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে। ভারতকে খুশি রাখা যেমন আমাদের জন্য জরুরি, তেমনি চীনকেও।

মনে রাখতে হবে, তিস্তা মহাপরিকল্পনার প্রস্তাব প্রথমে চীনের কাছ থেকেই এসেছে। তারা এ প্রকল্পে প্রায় ৮০০ বিলিয়ন ডলার খরচ করতেও প্রস্তুত। নির্বাচনের আগে ঢাকায় চীনের রাষ্ট্রদূত সরেজমিন তিস্তা ব্যারাজ এলাকা সফরও করেছেন। কাজেই, ভারত যদি চীনকে বাদ দিয়ে এ প্রকল্প নিজেরাই করতে চায়, তাহলে তাদের প্রস্তাব চীনের চেয়ে বেশি আকর্ষণীয় হতে হবে। অতএব, তিস্তা প্রকল্প ভারতকে দেওয়ার আগে এর সমুদয় খরচ যাতে বাংলাদেশের জনগণকে বহন করতে না হয়, সে ব্যাপারে সরকারকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তবে এ প্রকল্পে ভারতের সম্পৃক্ততার বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনার বক্তব্য এবং এ প্রকল্প করার ব্যাপারে বিবিসিকে দেওয়া ভারতীয় কর্মকর্তাদের আত্মবিশ্বাসী বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে অনুমান করা যায়, ভারতকে বাদ দিয়ে এ প্রকল্পে বাংলাদেশ সরকার চীনকে জড়িত করবে না। যখন কেউ কারও ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন অনেক ক্ষেত্রেই তাদের অনেক সীমাবদ্ধতাও থাকে। এ ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। নদীর পানির ব্যাপারে আমাদের ভারতের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করতে হবে। কাজেই যতটুকু তারা প্রয়োজন মনে করবে, ততটুকুই দেবে। এর চেয়ে বেশি দেবে, সে আশা করা যায় না।

একেএম শামসুদ্দিন : অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     More News Of This Category