আজ ১০ই আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ২৪শে জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

সময় : সকাল ৭:০৯

বার : সোমবার

ঋতু : বর্ষাকাল

ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশ ব্যাংকের বারবার নীতি বদলে ফলে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘনঘন নীতি পরিবর্তনের ফলে অর্থনীতিতে অস্বস্তি বাড়ছে বলে মন্তব্য করেছেন ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (এফবিসিসিআই) সভাপতি মাহবুবুল আলম। তিনি বলেন, বারবার নীতি পরিবর্তনে ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তবে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে সবকিছু স্বাভাবিক হওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন গর্ভনর। পাশাপাশি সমাধান হবে রিজার্ভ সমস্যারও।
গতকাল বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের গর্ভনর আব্দুর রউফ তালুকদারের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা জানান এফবিসিসিআই সভাপতি। তিনি বলেন, দেশে ডলারের দর বাড়ায় খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়বে। তাই এটি যেন আর না বাড়ে সে বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে হবে।
মাহবুবুল আলম বলেন, সুদহার যাতে ১৪ শতাংশের বেশি না হয় দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। সেই দাবি গভর্নরকে জানালে তিনি সুদহার ১৪ শতাংশের বেশি হবে না বলে আস্বস্ত করেছেন।

এসময় উপস্থিত ছিলেন- এফবিসিসিআইর সাবেক সভাপতি জসিম উদ্দিন, বিজিএমইএ সভাপতি এস এম মান্নান কচি, বিটিএমএ সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন, বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম এবং প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আহসান খান চৌধুরীসহ শীর্ষ ব্যবসায়ীরা।
এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, ডলারের দাম হঠাত্ করেই ৭ টাকা বেড়ে যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ব্যবসায়ীরা। আমরা গভর্নরকে বলেছি এটি যেন ১১৭ টাকায় থাকে। তিনি আমাদের এক টাকা কম অথবা বেশির মধ্যে রাখার কথা বলেছেন। ডলার নিয়ে এখনো সমস্যা আছে। আমরা এলসি করার সময়ও একই রেট থাকার কথা বলেছি। গভর্নর আমাদের বলেছেন ডলার সংকট রয়েছে, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে সংকট পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।

সুদহার বিষয়ে মাহবুবুল আলম বলেন, ডলারের মতো সুদহার বাজারের ওপরে ছেড়ে দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর মধ্যেই আটকে দেবে সুদহার। তবে ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণে খরচ ৬ থেকে ৮ শতাংশ হলে সুদের হার ১২ শতাংশের ওপরে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।

নির্দিষ্ট সীমার বেশি ঋণ পেতে কয়েকটি শিল্প গ্রুপ ও ব্যবসায়ী সংগঠনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, ব্যাংক খাতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে একক ঋণসীমা লঙ্ঘন করা যাবে না। এ সংক্রান্ত আবেদনও নির্দেশনার পরিপন্থি। এ বিষয়ে এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, একক গ্রাহক ঋণসীমা হঠাৎ বেড়েছে ডলার রেটের কারণে। ডলারের দাম একবারে বেশি হওয়ায় ঋণও বেড়েছে। ডলারের দাম একসঙ্গে ৭ টাকা বাড়ার কারণে যে পরিমাণ ঋণ বেড়েছে সে পরিমাণ টাকার দীর্ঘমেয়াদি ঋণের আবেদন করেছেন ব্যবসায়ীরা। এখানে বিশেষ বিবেচনায় ছাড় দেওয়ার কথা জানিয়েছেন গভর্নর।

তিনি বলেন, ব্যবসায়ীরা যেন বেশি ক্ষতিগ্রস্ত না হন তেমন ব্যবস্থা ভবিষ্যতে নেওয়া হবে। আমি মনে করি দেশের মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির সঙ্গে সুদহারের কোনো সম্পর্ক নেই।

বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ডলারের দাম বেশি হওয়ায় তারা এলসি খুলতে পারছেন না। পাশাপাশি কোনো ব্যাংক ডলারের নির্ধারিত দামের অতিরিক্ত দাম নিলেই গভর্ণর অভিযোগ করার কথা বলেছেন, যা নিয়ে কাজ করবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

তিনি বলেন, ডলারের দাম বাড়ায় কিছু গ্রাহকের নির্ধারিত সীমার চেয়ে বেশি ঋণ হয়েছে। ওই গ্রাহককে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হবে। এতে তার ঋণসীমা আইনের লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হবে না। বিষয়টি সমাধানে ব্যাংক এবং গ্রাহকভিত্তিক বিশেষ সুবিধা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন গভর্নর। ফান্ডেড এবং নন-ফান্ডেড মিলিয়ে একজন গ্রাহকের ২৫ শতাংশের বেশি ঋণ না পাওয়ার শর্ত থাকলেও এ পরিস্থিতিতে তাদের জন্য বিশেষ বিবেচনা করা হবে।

এর আগে গত ৮ মে ব্যাংক ঋণের সুদহার নির্ধারণ পদ্ধতি সিক্স মান্থ মুভিং অ্যাভারেজ রেট (স্মার্ট) প্রত্যাহার করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ওই নির্দেশনার ফলে এখন থেকে ব্যাংকার-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে ঋণের সুদহার নির্ধারিত হবে।

এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, সুদের হার বৃদ্ধি করা হলে ব্যবসা খরচ বেড়ে যাবে এবং স্থানীয় শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় মূল্য অত্যাধিক বৃদ্ধি পাওয়ায় বিশেষ করে মার্কিন ডলারের বিনিময় মূল্য ৮৫ টাকা থেকে ১১০-১১৭ টাকা হওয়ায় ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে কোনো কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে এবং ঋণ খেলাপিতে পরিণত হচ্ছে।

তিনি জানান, কাঁচামাল আমদানিনির্ভর শিল্পপ্রতিষ্ঠান বিলম্বিত ঋণপত্রের মাধ্যমে কাঁচামাল আমদানি করে। উত্পাদনকারী ও ব্যবসায়ীদের সবসময় বিলম্বিত ঋণপত্রের ওপর নির্ভরশীল থাকতে হয়, তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে কিছু সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। যেমন- বিলম্বিত ঋণপত্র সর্বোচ্চ ৩৬০ দিনের জন্য হয়ে থাকে। বিলম্বিত ঋণের বিপরীতে আমদানি করা কাঁচামালের মাধ্যমে উত্পাদিত পণ্য বিক্রয় সংক্রান্ত হিসাব আগেই সম্পন্ন হওয়ার কারণে উত্পাদনকারীদের পক্ষে বর্তমানে ডলারের অতিরিক্ত বিনিময় মূল্য সমন্বয়ের কোনো সুযোগ থাকে না। ফলে উৎপাদনকারীদের জন্য অতিরিক্ত বিনিময় মূল্য সম্পূর্ণ লোকসানে পরিণত হয়। লোকসানের কারণে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ব্যাংকের দায় পরিশোধে ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে, দায় ফোর্সড লোনে পরিণত হচ্ছে এবং উত্পাদনকারীদের খেলাপি হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে হচ্ছে। তিনি বলেন, ডলারের বিনিময় হার বেড়ে যাওয়ায় চলতি মূলধনের চাহিদাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু ফোর্সড লোনের দায় সৃষ্টি হওয়ার ফলে উৎপাদনকারীদের চলতি মূলধন সীমা ব্যাংকগুলোতে কমে যাচ্ছে।

এফবিসিসিআই সভাপতি আরও বলেন, ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে অনেক ব্যবসায়ী ১০০ কোটি টাকা, কেউ আবার ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকার লোকসানে পড়েছেন। এসব হিসাব ব্যাংকগুলোর কাছে আছে। এই লোকসানের অর্থ দীর্ঘমেয়াদি ঋণে রূপান্তর করে পুনঃ তফসিল করে দেওয়ার জন্য আমরা বলেছি। বাংলাদেশ ব্যাংক এতে রাজি হয়েছে। তিনি বলেন, কোনো সত্ ব্যবসায়ী অর্থ পাচার করতে পারেন না। আমরা অসৎ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নেই।

এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি জসিম উদ্দিন বলেন, ডলারের দাম এত দিন ১১০ টাকা ছিল। তবে অনানুষ্ঠানিকভাবে ডলারের দাম আরও অনেক বেশি ছিল। এখন এর দাম ১১৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ডলারের দাম যেন হঠাৎ করে না বাড়ে, তা নিশ্চিত করা দরকার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     More News Of This Category