বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করতে ঢাকায় আসা ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সাথে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের এক বৈঠক দুই দেশের সম্পর্কের জন্য একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। জয়শঙ্কর তারেকের হাতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির চিঠি তুলে দেন, যা ভারত সরকারের পক্ষ থেকে গভীর সমবেদনা ও শোক প্রকাশের প্রতিফলন। এই সাক্ষাৎ ও প্রকাশিত বার্তাটি দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির সঙ্গে ভারতের দূরত্বকে কমিয়ে আনার এবং নতুন বাস্তবতায় সম্পর্কের নবায়নের ইঙ্গিত দিয়েছে। পূর্বে ভারতের পক্ষ থেকে বিএনপির খালেদা জিয়ার দর্শন ও রাজনীতিকে সন্দেহের চোখে দেখা হতো, কারণ দলের পাকিস্তানমুখী রাজনীতি ও জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট স্থাপন ছিল নয়াদিল্লির জন্য অগ্রহণযোগ্য। তবুও, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে ভারত ও বিএনপি উভয়ই তাদের পারস্পরিক দূরত্ব হ্রাস করে নতুন অবস্থানে আসার সংকেত দিচ্ছে। তারেক রহমানের পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির আল জাজিরা এই বৈঠককে ‘নতুন অধ্যায়ের সম্ভাবনা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে রাজনীতির উত্তেজনা ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন বৃদ্ধি পেয়েছে। শেখ হাসিনার শাসনের পতনের পর ভারতবিরোধী মনোভাব বৃদ্ধি পেয়েছিল, এবং দুই দেশের মধ্যে ভিসা কার্যক্রমও সাময়িক স্থগিত হয়েছিল। সেই সময় আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থেকে দূরে থাকায় বিএনপি সেই শূন্যতা পূরণের চেষ্টা করছে। জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে নতুন জোট গঠন করেছে বিএনপি, যা ভারতের জন্য তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য। তারেক রহমান ১৭ বছর পর দেশে ফিরে বলেছেন, তিনি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ চান, যেখানে সংখ্যালঘুর নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকবে। ভারতের সাবেক হাইকমিশনার ও পররাষ্ট্র সচিব হর্ষবর্ধন শ্রিংলা মনে করেন, নির্বাসনের সময় তারেক রাজনৈতিকভাবে পরিণত হয়েছেন এবং ভারতের দৃষ্টিতে তিনি এখন ‘সবচেয়ে নিরাপদ বিকল্প’। ২০১০-এর দশকে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক উত্তেজনায় ছিল, যেখানে ভারত অভিযোগ করেছিল বাংলাদেশে ভারতবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠী সক্রিয়। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে মোদি সরকারের শুভকামনা ও বিএনপির কৃতজ্ঞতা প্রকাশকে সম্পর্কের উন্নতির সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, অতীতের বোঝা থাকা সত্ত্বেও বাস্তবতার কারণে নয়াদিল্লি তারেক রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে বাধ্য হচ্ছে। তবে শুধু সৌজন্য সাক্ষাত ও শুভেচ্ছায় সম্পর্কের স্থায়ী পরিবর্তন আসবে না। বিএনপির উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেছেন, অতীত থেকে ‘পরিষ্কার বিচ্ছেদ’ ছাড়া নতুন সম্পর্ক গঠন সম্ভব নয়। শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে ভবিষ্যতের সরকার ভারতের ওপর চাপ অব্যাহত রাখবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বাংলাদেশে পাকিস্তানঘনিষ্ঠ বা ভারতবিরোধী তৎপরতা প্রতিহত করা। বিএনপি বলছে, তাদের লক্ষ্য প্রতিবেশীদের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানো এবং সম্পর্ককে ব্যক্তিকেন্দ্রিক থেকে জনগণের সম্পর্ক হিসেবে গড়ে তোলা। এই নতুন রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ এখন আগের থেকে অনেক বেশি প্রকাশ্য ও পরিবর্তনশীল।