সাম্প্রতিক ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপের পর থেকেই আন্তর্জাতিক মহলে ইরান সম্পর্কে নতুন করে আগ্রাসনের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানে ‘ভেনেজুয়েলা কৌশল’ প্রয়োগ করা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে সম্ভাবনাহীন। কারণ, ইরানের সামরিক ও কৌশলগত অবস্থান ভেনেজুয়েলার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী ও জটিল। ইরানের সামরিক সক্ষমতা বিশ্বমঞ্চে স্বীকৃত। প্রায় ১০ লাখ সেনাবাহিনী ও বিভিন্ন মিলিশিয়া বাহিনী নিয়ে ইরানের সামরিক শক্তি মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে অন্যতম বৃহৎ। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন যুদ্ধে অভিজ্ঞ এই বাহিনী ইরানের ভূখণ্ড এবং স্বার্থ রক্ষায় অত্যন্ত কার্যকর। পাশাপাশি আধুনিক ব্যালিস্টিক মিসাইল, দীর্ঘপাল্লার ড্রোন ও শক্তিশালী নৌবাহিনী ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও দৃঢ় করেছে। ভেনেজুয়েলার সামরিক সক্ষমতার সঙ্গে এর সরাসরি তুলনা চলে না। অপরদিকে, ইরানের ভূ-কৌশলগত অবস্থান আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। হরমুজ প্রণালী, যা বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ তেল পরিবহণের পথ, ইরানের নিয়ন্ত্রণে। এই প্রণালী বন্ধ হলে বিশ্বজুড়ে তেলের দাম স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি বেড়ে যেতে পারে, যা যুক্তরাষ্ট্রসহ বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। ইরানের শক্তিশালী আঞ্চলিক মিত্র নেটওয়ার্ক এবং পারমাণবিক কর্মসূচি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। লেবানন, ইরাক, সিরিয়া ও ইয়েমেনে ইরানের প্রভাবশালী অবস্থান এবং হিজবুল্লাহসহ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সমর্থন ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হস্তক্ষেপকে বহুমুখী সংকটের দিকে ঠেলে দিতে পারে। তাছাড়া, ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বের উদ্বেগ রয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রকে সর্তক থাকতে বাধ্য করে। রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে ইরানের ঘনিষ্ঠ কৌশলগত সম্পর্ক যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের সম্ভাবনা আরও কমিয়ে দেয়। যেকোনো সরাসরি হামলা এই দুই মহাশক্তির সঙ্গে বড় ধরনের আন্তর্জাতিক সংঘাতের ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে, যা বিশ্ব রাজনীতির ভারসাম্যকে বিপন্ন করবে। অর্থনৈতিক দিক থেকেও ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে মার্কিন সেনাদের বড় ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে যুদ্ধবিরোধী জনমত দিনদিন শক্তিশালী হচ্ছে, যা রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন প্রশাসনের জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক ঝুঁকি হিসেবে এ বিষয়টি বিবেচিত হচ্ছে। সুতরাং, ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক আগ্রাসনের সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে কম। বর্তমান জটিল ভূ-রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক প্রভাব এবং রাজনৈতিক চাপ মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্রকে ভিন্ন পথে এগোতে বাধ্য করছে। ইরানকে কেন্দ্র করে নতুন কোনো বড় সামরিক সংঘাত বিশ্ব মঞ্চে এক গভীর অস্থিরতা নিয়ে আসতে পারে, যা কেউই কামনা করে না।