একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলার মামলায়, রাষ্ট্রপক্ষ বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরসহ সব আসামির খালাসের বিরুদ্ধে আপিল করেছে। বুধবার (১৯ মার্চ) এ ব্যাপারে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় থেকে নিশ্চিত করা হয়, এবং আপিল বিভাগের কার্যতালিকাতেও বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হয়।
গত ১২ জানুয়ারি, একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলার মামলায় হাইকোর্টের রায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত তারেক রহমান ও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত লুৎফুজ্জামান বাবরসহ আসামিদের খালাস দেওয়া হয়। বিচারিক আদালতের রায় বাতিল করে বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান এবং বিচারপতি সৈয়দ এনায়েত হোসেনের বেঞ্চ এই রায় ঘোষণা করেন। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, আইনের ভিত্তিতে মামলার অভিযোগ গঠন করা হয়নি এবং ফলে বিচারিক আদালতের কার্যক্রম অবৈধ। অতএব, বিচারিক আদালতের ডেথ রেফারেন্স বাতিল এবং আসামিদের আপিল মঞ্জুর করা হয়েছে।
আদালতের পর্যবেক্ষণে আরও উল্লেখ করা হয়, “অন্য মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মুফতি আবদুল হান্নানের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি এবং ২৫ জন শ্রুতসাক্ষীর সাক্ষ্যই ছিল মামলার মূল ভিত্তি, তবে এই সাক্ষ্যগুলো একে অপরকে সমর্থন করেনি। কোনো চাক্ষুষ সাক্ষী ছিল না এবং মুফতি হান্নানের স্বীকারোক্তি কোনো আইনগত প্রমাণ ছিল না, কারণ তিনি জীবিত থাকাকালীন সেটি প্রত্যাহার করেছিলেন।”
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলায় ২৪ জন নিহত হন। আওয়ামী লীগ দাবী করেছে যে, এটি ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হামলা। হামলার পরদিন, মতিঝিল থানার তৎকালীন এসআই শরীফ ফারুক আহমেদ বাদী হয়ে মামলা করেন, এবং সিআইডি এই মামলার তদন্তভার গ্রহণ করে। চার বছর পর, তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে ২০০৮ সালের ১১ জুন সিআইডির জ্যেষ্ঠ এএসপি ফজলুল কবির আলাদা দুটি অভিযোগপত্র দেন। সেগুলিতে জঙ্গি দল হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশের নেতা মুফতি আবদুল হান্নানসহ ২২ জনকে আসামি করা হয়।
২০০৮ সালের ২৯ অক্টোবর, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল অভিযোগ গঠন করে মামলার বিচার শুরু করে, এবং ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর মামলার অধিকতর তদন্তের আবেদন করা হয়। সিআইডির বিশেষ সুপার আব্দুল কাহার আকন্দ ২০১১ সালে নতুন ৩০ আসামিকে যুক্ত করে সম্পূরক অভিযোগপত্র দেন, যেখানে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ বিএনপি-জামায়াতের নেতাদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই মামলায় মোট ৫২ আসামির বিচার শুরু হয়, কিন্তু ৩ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার পর ৪৯ জনের বিচার হয়।
২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর, বিচারিক আদালত রায় প্রদান করলে, বিএনপির লুৎফুজ্জামান বাবর, আবদুস সালাম পিন্টুসহ ১৯ জনের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, এবং তারেক রহমানসহ ১৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ১১ পুলিশ এবং সেনা কর্মকর্তাকেও বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
রায়ের পর ২৭ নভেম্বর, বিচারিক আদালতের রায় প্রয়োজনীয় নথিসহ হাইকোর্টের ডেথ রেফারেন্স শাখায় পাঠানো হয় এবং দণ্ডিতরা রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন। ২০২২ সালের ৪ ডিসেম্বর, ডেথ রেফারেন্স-আপিলের পেপারবুক প্রস্তুত হয়ে শুনানি শুরু হয়। তবে, বিচার বিভাগে পরিবর্তন আসলে, মামলার শুনানি হাইকোর্টের নতুন বেঞ্চে ৩১ অক্টোবর থেকে শুরু হয়। এবং ২৮ নভেম্বর, চূড়ান্ত শুনানির পর, উচ্চ আদালত মামলার সব আসামিকে খালাস দেয়।