বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি শুক্রবার ব্যাংককে অনুষ্ঠিত বিমসটেক সম্মেলনের ফাঁকে একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে মিলিত হন। এটি ছিল গত বছর আগস্টে ড. ইউনূস ক্ষমতা গ্রহণের পর দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে প্রথম বৈঠক। ৪০ মিনিটের এই আলোচনা ছিল খোলামেলা, ফলপ্রসূ এবং গঠনমূলক—এক কথায়, দুই দেশের সম্পর্কের জন্য একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচনকারী। বৈঠক শেষে, ড. ইউনূস প্রধানমন্ত্রী মোদিকে একটি বিশেষ আলোকচিত্র উপহার দেন। ছবিটি ২০১৫ সালের ৩ জানুয়ারি মুম্বাইয়ে অনুষ্ঠিত ১০২তম ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসের, যেখানে মোদি অধ্যাপক ইউনূসকে স্বর্ণপদক প্রদান করছেন। এই স্মৃতিচিহ্নটি যেন দুই দেশের বন্ধুত্বের একটি প্রতীক। অধ্যাপক ইউনূস বৈঠকে মোদিকে জানান, “বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে গভীরভাবে মূল্যায়ন করে। আমাদের ঐতিহাসিক, ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধন অত্যন্ত দৃঢ়।” তিনি ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে ভারতের জনগণ ও সরকারের সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের মধ্যে বহু উচ্চ পর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক যোগাযোগ হয়েছে, এবং তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, এই সম্পর্ক একটি ইতিবাচক পথে এগিয়ে যাবে, যা উভয় দেশের মানুষের কল্যাণে কাজে লাগবে। আলোচনার এক পর্যায়ে, অধ্যাপক ইউনূস বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে ভারতের সমর্থন চেয়েছেন আঞ্চলিক সহযোগিতা এগিয়ে নিতে। গঙ্গা পানি চুক্তি নবায়ন এবং তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি সম্পন্ন করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। সীমান্ত হত্যাকাণ্ড কমানোর আহ্বান জানিয়ে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, “প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, যাদের বেদনা আমি অনুভব করি। আমাদের একসাথে কাজ করে এটি বন্ধ করতে হবে।” মোদি পাল্টা বলেন, ভারতীয় সীমান্তরক্ষীরা কেবল আত্মরক্ষার্থে গুলি চালায় এবং বেশিরভাগ ঘটনা ঘটে ভারতীয় ভূখণ্ডে। ড. ইউনূস ভারতে আশ্রিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানান। তিনি বলেন, “তিনি (শেখ হাসিনা) বিদেশে বসে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সম্পর্কে মিথ্যা ও উস্কানিমূলক মন্তব্য করে যাচ্ছেন, যা ভারতের অতিথিপরায়ণতার অপব্যবহার।” তিনি জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশনের প্রতিবেদন উল্লেখ করেন, যেখানে বলা হয়েছে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে প্রায় ১ হাজার ৪০০ জন আন্দোলনকারী নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ১৩ ভাগ শিশু। ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার প্রসঙ্গ তুললে, অধ্যাপক ইউনূস বলেন, “এই ধরনের বেশিরভাগ রিপোর্টই অতিরঞ্জিত ও মিথ্যা। আপনি চাইলে আপনার সাংবাদিকদের পাঠান, নিজেরাই যাচাই করে দেখুন।” মোদি বলেন, ভারতের সমর্থন কোনো নির্দিষ্ট দল বা ব্যক্তি নয়, বরং বাংলাদেশের মানুষের প্রতি। তিনি ইউনূসকে ঈদুল ফিতরের শুভেচ্ছা জানান এবং বলেন, “আপনার নেতৃত্বে আমরা একটি অগ্রসর, গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ দেখতে চাই।” বৈঠকের পর ভারতীয় পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি সাংবাদিকদের জানান, বৈঠকে মোদি হিন্দুসহ বাংলাদেশি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিষয়টি উত্থাপন করেন এবং বাংলাদেশি হিন্দু ধর্মাবলম্বীসহ অন্যান্য সংখ্যালঘুদের নিয়ে ভারতের চিন্তার বিষয়টি জানান। তিনি শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে আলোচনা হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন, তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলার জন্য সময়ের অপেক্ষা করতে হবে বলে মন্তব্য করেন। মিশ্রি বলেন, প্রধানমন্ত্রী মোদি অন্তর্ভুক্তিমূলক, প্রগতিশীল, শান্তিপূর্ণ, স্থিতিশীল এবং গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের প্রতি তার সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি দুই দেশের সম্পর্কে প্রভাব ফেলে এমন কথাবার্তা এড়িয়ে চলার অনুরোধ জানান। এই বৈঠক, নিঃসন্দেহে, দুই দেশের সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।