বাজারে চালের সরবরাহ পর্যাপ্ত। সরকারের গুদামেও মজুতের কোনো ঘাটতি নেই। রোজার এই সময়ে শাক-সবজি, মাছ-মাংসসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামেও ভোক্তারা কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছেন। কিন্তু এই স্বস্তির মাঝেই চালের বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে চারটি মিল কোম্পানি। রোজার সময়ে অতিরিক্ত মুনাফা লুটতে তারা মিল পর্যায়ে প্রতি বস্তা (৫০ কেজি) মিনিকেট চালের দাম ৫০০ টাকা বাড়িয়ে দিয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারেও, যেখানে মিনিকেট চালের দাম হু হু করে বাড়ছে। বর্তমানে প্রতি কেজি মিনিকেট চাল ক্রেতাদের ৯০ টাকা পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে, যা সাধারণ ভোক্তাদের জন্য ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গত চার মাস ধরে চালের বাজার অস্থির। ডিসেম্বরে মিল পর্যায়ে প্রতি বস্তা মিনিকেট চাল ৩,৩০০ টাকায় বিক্রি হলেও জানুয়ারিতে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩,৯০০ থেকে ৪,০০০ টাকা। যদিও কিছুদিন আগে দাম কিছুটা কমে প্রতি বস্তা ৩,৮৫০ টাকায় নেমে এসেছিল, কিন্তু বৃহস্পতিবার তা আবার বেড়ে ৪,২০০ থেকে ৪,৪০০ টাকায় পৌঁছেছে। মিল পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২৫ কেজির বস্তা নাজিরশাইল চাল এখন ১,৯০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা আগে ২,০০০ টাকা ছিল। অর্থাৎ বস্তায় ১০০ টাকা কমেছে। অন্যদিকে, বিআর ২৮ জাতের চাল প্রতি বস্তা (৫০ কেজি) ২,৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা চার মাস আগে ২,৫০০ টাকা ছিল। স্বর্ণা জাতের চাল প্রতি বস্তা বিক্রি হচ্ছে ২,৪৫০ টাকায়।
চালের দাম বাড়ার পেছনে কারা দায়ী? কাওরান বাজারের আল্লাহর দান রাইস এজেন্সির মালিক ও পাইকারি চাল ব্যবসায়ী মো. সিদ্দিকুর রহমান বলেন, “বৈশাখে নতুন মিনিকেট চাল বাজারে আসবে। কিন্তু এখন বেশিরভাগ মিলে মিনিকেট চালের মজুত নেই। মাত্র চারটি মিল কোম্পানি—তীর, মঞ্জুর, সারগর ও মোজাম্মেল—এই চালের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করছে। তারা বাড়তি দামে পাইকারি আড়তদারদের কাছে চাল বিক্রি করছে। আমরা তাদের ধার্য করা দামেই চাল কিনতে বাধ্য হচ্ছি। এই চার কোম্পানি পুরো বাজারকে জিম্মি করে রেখেছে। মিল পর্যায়ে তদারকি বাড়ালে দাম কমে আসবে।” তিনি আরও জানান, মিল থেকে প্রতি বস্তা মিনিকেট চাল এনে পাইকারি পর্যায়ে ৪,২৫০ টাকায় বিক্রি করছেন, যা আগে ৩,৯০০ টাকা ছিল। বিআর ২৮ জাতের চাল প্রতি বস্তা ২,৮৫০ টাকা এবং স্বর্ণা জাতের চাল ২,৫৫০ থেকে ২,৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
রাজধানীর খুচরা বাজারে অবস্থা আরও ভয়াবহ। বৃহস্পতিবার প্রতি কেজি মিনিকেট চাল ৮৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা ১৫ দিন আগে ৭৮ টাকা ছিল। ভালো মানের মিনিকেট চালের দাম উঠেছে ৯০ টাকা পর্যন্ত, যা আগে ৮৪ টাকায় বিক্রি হতো। বিআর ২৮ জাতের চাল প্রতি কেজি ৬৫ টাকা এবং স্বর্ণা চাল ৫৫ থেকে ৫৬ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে।
মালিবাগ কাঁচাবাজারের খালেক রাইস এজেন্সির মালিক ও খুচরা চাল বিক্রেতা মো. দীদার হোসেন বলেন, “মিল মালিকদের কারসাজির কারণে গত চার মাস ধরে বাজারে অস্থিরতা চলছে। মাত্র কয়েকটি মিলের কাছে মিনিকেট চালের মজুত থাকায় তারা দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু মিল পর্যায়ে তদারকির অভাবেই এই সমস্যা চলছে। সংস্থাগুলো খুচরা বাজারে তদারকি করলেও মিল পর্যায়ে মনিটরিং না করায় দাম কমছে না।”
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন বলেন, “বাজারে একাধিক সংস্থা তদারকি করলেও ভোক্তারা এর সুফল পাচ্ছেন না। পণ্যের দাম বাড়লেই কর্মকর্তারা অভিযান চালান, কিন্তু যেখানে মূল কারসাজি হচ্ছে—মিল পর্যায়ে—সেখানে কোনো মনিটরিং নেই। ফলে অসাধু ব্যবসায়ীরা ভোক্তাদের নাজেহাল করার সুযোগ পাচ্ছে।”
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ আলীম আখতার খান জানান, “প্রতিদিনই বাজারে অভিযান চলছে। অনিয়ম ধরা পড়লেই আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। কাউকেই ছাড় দেওয়া হচ্ছে না।”
খাদ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সরকারি গুদামে (১৯ মার্চ) ১৩ লাখ ৬৩ হাজার ৫২১ টন খাদ্যশস্য মজুত রয়েছে। এর মধ্যে ৯ লাখ ৬৩ হাজার ৪৮৮ টন চাল এবং ৩ লাখ ৯৫ হাজার ৮৬২ টন গম রয়েছে। এছাড়া ৬,২৭৬ টন ধান মজুত আছে। চালের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে নভেম্বরে আমদানির ওপর ২ শতাংশ অগ্রিম আয়কর রেখে বাকি শুল্ক প্রত্যাহার করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে ব্যবসায়ীদের কারসাজিতে ভোক্তাদের পকেট ফাঁকা হচ্ছে।
খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে স্বল্প মূল্যে চাল সরবরাহ নিশ্চিত করতে মার্চ ও এপ্রিল মাসে প্রায় ৭ লাখ টন চাল বণ্টন করা হবে। এছাড়া আসন্ন বোরো মৌসুমে চালের উৎপাদন ভালো হবে বলে আশা করা হচ্ছে, যা চালের দাম আরও কমিয়ে আনতে পারে। সরকার খাদ্য ঘাটতি এড়াতে পর্যাপ্ত মজুত গড়ে তুলেছে এবং বিদেশ থেকে চাল আমদানি অব্যাহত রেখেছে। নিয়মিত বাজার মনিটরিংয়ের মাধ্যমে খাদ্য মূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখার চেষ্টা চলছে। দেশে কোনো খাদ্য সংকট হবে না বলে আশ্বস্ত করা হয়েছে।