অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ঘোষিত তিনটি মৌলিক দায়িত্ব—প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, স্বৈরাচারের বিচার ও সুষ্ঠু নির্বাচন—এখন সংকটের মুখে। গত ৫ আগস্ট মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের সমাবেশে তিনি স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছিলেন: “আমরা একটি নির্বাচিত সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করব।” সেই প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ৬ আগস্ট নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দিয়ে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে নির্বাচনের আয়োজন করতে নির্দেশ দেন। কিন্তু মাত্র ছয় দিন পরই তাঁর ঘনিষ্ঠ “বিপ্লবী” সহযোগীরা ঘোষণা দেন—”ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হবে না”। এই ঘোষণায় গোটা জাতি হতবাক, এবং প্রশ্ন উঠেছে: ড. ইউনূস এখন কোন পথ বেছে নেবেন? এই সংকটের পেছনে কাজ করছে একটি গভীর রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব। ইউনূস সরকারের কিছু সমর্থক “নতুন বন্দোবস্ত” ও “দ্বিতীয় স্বাধীনতা”-র ধারণা প্রচার করছেন, যা ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে অস্বীকার করার সামিল। এই ন্যারেটিভটি ঐতিহাসিকভাবে সন্দেহজনক, কারণ ১৯৭১ সালে যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধিতা করেছিল—রাজাকার, আলবদর বাহিনী—তারাই আজ ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’র নামে ৭১-এর অর্জনকে মুছে ফেলতে চাইছে। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার ছিলেন এবং তিনিই প্রথম স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। এই ইতিহাসকে অস্বীকার করার চেষ্টা চলছে নির্বাচনবিরোধী গোষ্ঠীর মাধ্যমে। ড. ইউনূস নিজে লন্ডনে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের সাথে বৈঠকে ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের সমর্থন জানালেও, তাঁরই আশেপাশের শক্তি তা বানচাল করতে মরিয়া। এই দ্বন্দ্ব তাঁকে “শ্যাম রাখবেন নাকি কুল রাখবেন”—এর কঠিন সমীকরণে ফেলেছে। যদি তিনি নির্বাচন ঠেকাতে দেন, তাহলে নোবেলজয়ী হিসেবে তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতা ধূলিসাৎ হবে এবং তিনি ষড়যন্ত্রের সহযোগী বলে চিহ্নিত হবেন। অন্যদিকে, যদি তিনি দৃঢ়ভাবে নির্বাচন চালিয়ে যান, তাহলে তাঁর “আদর্শের অনুজদের” বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হবে। এমন সংকটময় মুহূর্তে চন্দন গাছের উপমা বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। চন্দন গাছ জীবিত থাকতে শীতল ছায়া দেয়, মৃত্যুর পর সুবাস ছড়ায়—ঠিক যেমন পিতা-মাতারা জীবিত থাকতে সন্তানদের রক্ষা করেন, মৃত্যুর পর তাদের আদর্শ পাথেয় হয়ে ওঠে। ড. ইউনূস এবং তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে এই যুগের “জাতির চন্দন” বলা হয়েছে। তাঁরা দুজনই ত্যাগ ও নিবেদনের মাধ্যমে দেশের ক্রান্তিকালে ভরসাস্থল হয়েছেন। কিন্তু এখন এই দুই চন্দন বৃক্ষই হুমকির মুখে, কারণ নির্বাচন বিলম্বিত হলে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের স্বপ্ন ভেঙে পড়বে। ইতিমধ্যেই সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ দানা বাঁধছে। ৫ আগস্টের “অসহযোগ আন্দোলন” যদি নির্বাচনের দিকে না নিয়ে যায়, তাহলে প্রতিবিপ্লবের মুখোমুখি হতে হবে সরকারকে। মানুষ প্রশাসনের ব্যর্থতা—সাদা পাথর লুট, দুর্নীতি, নাগরিক নিরাপত্তাহীনতা—নিয়ে ক্ষুব্ধ। আন্তর্জাতিক মহলও দ্রুত নির্বাচনের দাবি জানাচ্ছে। ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যেই তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। মনজুরুল ইসলামের আশঙ্কা সত্যি হতে চলেছে: নির্বাচনবিরোধীরা যদি ঠিক সময়ে প্রতিবিপ্লবের মুখোমুখি না হয়, তাহলে বাংলাদেশ ১৯৭১-পরবর্তী সব অর্জন হারাতে বসবে। ড. ইউনূসকে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে—তিনি কি তাঁর বিপ্লবী সহযোগীদের নিয়ন্ত্রণে এনে নির্বাচনের পথ প্রশস্ত করবেন, নাকি নৈতিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হবেন? জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এই দুই চন্দন বৃক্ষের দৃঢ়তায়। তাঁদের ত্যাগ ও আদর্শই পারে এই ধূসর সময়ে আলোর পথ দেখাতে। “চন্দনের মতো সুবাসিত নেতৃত্ব ছাড়া কোনো জাতি সংকট কাটিয়ে উঠতে পারে না। ড. ইউনূস ও খালেদা জিয়ার হাতেই এখন বাংলাদেশের শেষ রক্ষার চাবি।” — মনজুরুল ইসলাম।