যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি বিভিন্ন দেশের পণ্যের ওপর ‘রিসিপ্রোকাল ট্যারিফ’ বা পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন, এবং এই তালিকায় বাংলাদেশের নামও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। বাংলাদেশি পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ৩৭ শতাংশ শুল্ক বসিয়েছে, যা পূর্বে ছিল মাত্র ১৫ শতাংশ। বুধবার, ৩ এপ্রিল, স্থানীয় সময় বিকাল চারটায় হোয়াইট হাউজে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই নতুন সিদ্ধান্তের কথা জানান। যুক্তরাষ্ট্রের অফিস অব দ্য ইউনাইটেড স্টেট ট্রেড রিপ্রেজেন্টেটিভের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল আনুমানিক ১০ দশমিক ছয় বিলিয়ন ডলার। গত বছর বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২ দশমিক দুই বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে, আর বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রপ্তানি হয়েছে প্রায় সাড়ে আট বিলিয়ন ডলারের। ঢাকায় অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে কৃষিপণ্য—যেমন খাদ্যশস্য, বীজ, সয়াবিন, তুলা, গম এবং ভুট্টা—এছাড়া যন্ত্রপাতি এবং লোহা ও ইস্পাত পণ্য। অপরদিকে, বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের আমদানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে তৈরি পোশাক, জুতা, টেক্সটাইল সামগ্রী ও কৃষিপণ্য। ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন শুল্ক পরিকল্পনায় এশিয়ার বিভিন্ন দেশের পণ্যের ওপর শুল্কের হার ১০ শতাংশ থেকে শুরু করে ৪৮ শতাংশ পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, চীনের ওপর ৩৪ শতাংশ, ভিয়েতনামের ওপর ৪৬ শতাংশ, এবং বাংলাদেশের ওপর ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে, ভারত, পাকিস্তান, এবং তুরস্কের মতো দেশগুলো কম শুল্কের সুবিধা নিয়ে মার্কিন বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। কোয়েম্বাটোরভিত্তিক ইন্ডিয়ান টেক্সপ্রেনিউয়ার্স ফেডারেশনের (আইটিএফ) আহ্বায়ক প্রভু দামোদরন দ্য হিন্দু বিজনেস লাইনকে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন পাল্টা শুল্ক কাঠামো বাণিজ্য অংশীদারদের মধ্যে একটি ন্যায্য প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র তৈরির লক্ষ্যে করা হয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, মার্কিন ভোক্তাদের প্রতিক্রিয়া এবং তাদের ভোগের আচরণ এই শুল্কের কার্যকারিতা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এছাড়া, পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে মার্কিন ভোক্তারা কম ক্রয় করতে পারে, যা সকলের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশ থেকে একটি শার্টের দাম যদি আগে ১০ ডলার ছিল, তবে নতুন শুল্কের কারণে তা ১২ ডলারে পৌঁছাতে পারে। কারণ, শুল্ক আরোপ করা হয় বন্দরে আমদানির সময়ের ক্রয়মূল্যের ওপর, বাজার মূল্যের ওপর নয়। অন্যদিকে, বাংলাদেশ মূলত মধ্যম ও কম দামের পণ্য রপ্তানি করে, যার দাম যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ২০ থেকে ৬০ ডলারের মধ্যে। ভিয়েতনাম, চীন বা ভারত উচ্চ মূল্যের পোশাক রপ্তানি করছে, ফলে তারা যতটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, বাংলাদেশ ততটা হবে না বলেই মনে করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে, ট্রাম্পের এই শুল্ক ঘোষণার প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পাল্টা শুল্ক বিশ্বকে বাণিজ্যযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে। ইতিমধ্যে, মার্কিন শেয়ারবাজারে এর লক্ষণ দেখা গেছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মার্কিন পণ্যের ওপর প্রচলিত শুল্কের হার ৭৪ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩০ শতাংশে নামিয়ে আনা হলে, বাংলাদেশি পণ্যে মার্কিন শুল্ক হবে ১৫ শতাংশ। এই প্রক্রিয়ায়, আমদানি ও রপ্তানির যোগ-বিয়োগ এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার দিকে তাকালে দেখা যাবে, বাংলাদেশ লাভবান হতে পারে।