পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ পথ হরমুজ প্রণালী ঘিরে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা ক্রমশ তীব্র রূপ ধারণ করছে। ইরানের সাময়িকভাবে এই প্রণালী বন্ধের ঘোষণা বিশ্ববাজারে তেলের দামের ব্যাপক উত্থান ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সৃষ্টি করেছে। তেহরান তার সামরিক শক্তির প্রদর্শনী হিসেবে এই পদক্ষেপ নিলেও, একই সময়ে জেনেভায় ওমানের মধ্যস্থতায় দুই দেশের মধ্যে আমলে নেওয়া কথোপকথন চলছে, যা সংকটের মীমাংসায় একরকম রুদ্ধদ্বার পরিস্থিতি তৈরি করেছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির কঠোর হুঁশিয়ারি মার্কিন নৌবাহিনীর রণতরীগুলোকে ধ্বংস করার সক্ষমতার কথা উল্লেখ করে পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে দুইটি বিমানবাহী রণতরী প্রেরণ করে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে শক্তি প্রদর্শন করেছে। এই পদক্ষেপকে ট্রাম্প প্রশাসন শান্তি প্রতিষ্ঠার কৌশলের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করলেও, তারা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে চুক্তি না করলে কঠোর প্রতিক্রিয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক সংকট দেশের পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও মুদ্রাস্ফীতি বিরূপ প্রভাব ফেলেছে সাধারণ মানুষের ওপর, যা সরকারের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। তেহরান এই আন্দোলনগুলোকে ‘আমেরিকান-জায়নবাদী ষড়যন্ত্র’ হিসেবে গণ্য করে কঠোর দমন-পীড়ন চালিয়ে যাচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ইরানের কূটনৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করেছে। জেনেভায় ওমানের মাধ্যমে চলমান আলোচনা মূলত ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আলোচনায় কেন্দ্রীভূত হলেও, যুক্তরাষ্ট্র বিষয়টিকে ব্যাপক করতে চায়। তারা ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল উন্নয়ন ও আঞ্চলিক মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলোর সমর্থন প্রত্যাহারের দাবিও তুলেছে, যা আলোচনার ভবিষ্যত অনিশ্চিত করে তুলেছে। মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে ইরানের প্রভাবশালী মিত্র হিজবুল্লাহ ও হামাস সাম্প্রতিক যুদ্ধে দুর্বল হয়েছে, যদিও ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহী ও ইরাকি মিলিশিয়াদের মাধ্যমে ইরান এখনও আঞ্চলিক প্রভাব বজায় রাখার চেষ্টা করছে। তবে ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতের কারণে তেহরানকে নতুন কৌশল অবলম্বন করতে হচ্ছে। গত বছরের সংক্ষিপ্ত যুদ্ধের স্মৃতি এখনও তাজা, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের পাশে থেকে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় আঘাত হানে। এই পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালী বন্ধের হুমকি ইরানের শেষ অস্ত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে, কারণ এই প্রণালী দিয়ে বিশ্ব জুড়ে জ্বালানি তেলের বিশাল পরিমাণ প্রবাহিত হয়, যা বন্ধ হলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যাপক বৃদ্ধি পাবে। উপসাগরীয় দেশগুলো, বিশেষ করে সৌদি আরব, কাতার ও কুয়েত গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং তারা অঞ্চলজুড়ে ব্যাপক সংঘাত এড়াতে চেষ্টা করছে। ঐতিহ্যবাহী মধ্যস্থতাকারী ওমান শান্তি প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে এবং দুই পক্ষকে মীমাংসার টেবিলে বসাতে সচেষ্ট রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি হরমুজ প্রণালী ও পারস্য উপসাগরের ভবিষ্যতকে অনিশ্চিত করে রেখেছে। ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর সামরিক হুঁশিয়ারি ও খামেনির আপোষহীন অবস্থানের মধ্যে সমঝোতার পথ খুঁজে পাওয়া দুশ্চিন্তার বিষয়। এই দ্বন্দ্বের ঝড়ের মাঝখানে হরমুজ প্রণালী শেষ পর্যন্ত কার নিয়ন্ত্রণে থাকবে, সেটাই এখন বিশ্বের জন্য বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।