রপ্তানি আয়ে ধারাবাহিক পতন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় উদ্বেগজনক হারে কমছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই অঞ্চলে রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে মাত্র ৮২৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার—গত বছরের তুলনায় ১০৮ মিলিয়ন ডলার কম। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, ওমান, কুয়েতসহ ১১টি দেশে রপ্তানি হ্রাসের এ ধারা চলমান। বিশেষজ্ঞরা এটিকে “নীতিগত ব্যর্থতা ও বাজার বোঝার অক্ষমতা” বলে চিহ্নিত করছেন 1।
কেন হাতছাড়া হচ্ছে বাজার? ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান মো. আনোয়ার হোসেনের মতে, “মধ্যপ্রাচ্যের চাহিদা ও বাংলাদেশের উৎপাদনের মধ্যে বেমানান” মূল সমস্যা 1: পোশাক শিল্পের সীমাবদ্ধতা: এই অঞ্চলের অধিবাসীরা যে ধরনের পোশাক ব্যবহার করে (যেমন: স্থানীয় ঐতিহ্যভিত্তিক ডিজাইন), তা বাংলাদেশে উৎপাদিত হয় না। কৃষিপণ্যের ওপর নির্ভরতা: রপ্তানির সিংহভাগই শাকসবজি ও খাদ্যপণ্য—যার বেশিরভাগই প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোগের জন্য পাঠানো হয়। হালাল পণ্যের সুযোগের অবহেলা: বিশ্বের ৩.৩ ট্রিলিয়ন ডলারের হালাল মার্কেটে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ মাত্র ৮৪৩ মিলিয়ন ডলার 1। হালাল বাজার: অব্যবহৃত ট্রিলিয়ন ডলারের সম্ভাবনা বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই) এর তথ্যমতে, হালাল পণ্যের বৈশ্বিক বাজার তৈরি পোশাক শিল্পের চেয়েও ৮০% বড় 1। কিন্তু বাংলাদেশ এই বাজারে টিকতে পারছে না, কারণ: সনদ সংকট: মধ্যপ্রাচ্যে রপ্তানির জন্য হালাল সার্টিফিকেশন বাধ্যতামূলক, কিন্তু বাংলাদেশে এর জন্য মাত্র দুটি প্রতিষ্ঠান (বিএসটিআই ও ইসলামিক ফাউন্ডেশন) দায়ী। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ল্যাবটি ২০১৭ সালে উদ্বোধনের পরও যন্ত্রপাতির অকার্যকরতার কারণে সচল হয়নি 1। নন-ফুড পণ্যের প্রতি উদাসীনতা: বিসিআই প্রেসিডেন্ট আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজের মতে, “হালাল এখন শুধু খাদ্যে সীমিত নয়—পোশাক, প্রসাধনী, ইলেকট্রনিক্সও এর আওতায় পড়ে” 1। আলোর রেখা: বিএসটিআইর হালাল ল্যাব উদ্বোধন গত ১৪ জুলাই, বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) নিজস্ব হালাল পরীক্ষাগার চালু করেছে 1। এটি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ, কারণ: এই ল্যাব স্থানীয়ভাবে হালাল সনদ প্রদান করবে, যা রপ্তানিকারকদের বাইরের প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরতা কমাবে। খাদ্য, প্রসাধনী, ওষুধ ও নিত্যপণ্যের গুণগত মান নিশ্চিত করে মধ্যপ্রাচ্যে প্রবেশাধিকার সহজ করবে। উদ্যোগগুলো এখনই নিতে হবে বিশ্লেষকরা মধ্যপ্রাচ্যের বাজার ধরে রাখতে নিম্নলিখিত কৌশল প্রস্তাব করছেন: হালাল নন-ফুড পণ্যের উৎপাদন: পোশাক, প্রসাধনী, ইলেকট্রনিক্সে হালাল স্ট্যান্ডার্ড চালু করে পণ্য বৈচিত্র্য আনতে হবে। বাজার গবেষণা জোরদার: মধ্যপ্রাচ্যের ভোক্তাদের রুচি, জলবায়ু ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে উপযোগী পণ্য ডিজাইন করতে হবে। সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা: ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যানের মতে, “হালাল পণ্যের রপ্তানি বাড়াতে বেসরকারি খাতকে নীতিগত সহায়তা ও ট্যাক্স ইনসেনটিভ দিতে হবে” 1। শেষ কথা: সময় ফুরিয়ে আসছে মধ্যপ্রাচ্যের বাজার রক্ষা কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক উভয় সক্ষমতার পরীক্ষা। হালাল শিল্পের ট্রিলিয়ন ডলারের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে বিএসটিআইর নতুন ল্যাব একটি আশাব্যঞ্জক সূচনা। কিন্তু শুধু সার্টিফিকেশনই যথেষ্ট নয়—বাংলাদেশকে এই অঞ্চলের ভোক্তাদের চাহিদা মেটানোর মতো পণ্য স্ট্র্যাটেজি তৈরি করতে হবে। নইলে ইউরোপ-আমেরিকার পর বাংলাদেশের তৃতীয় সম্ভাবনাময় রপ্তানি বাজারও হাতছাড়া হয়ে যাবে